স্বপ্নের ঠিকানা

লেখকঃ আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ

এক. বাংলাদেশ

সবুজে শ্যামলে ঘেরা এই দেশ। এইতো আমার দেশ।

এ আমার দেশ। আমার পিতা, পিতামহের দেশ। অনাগত দিনের উত্তর প্রজন্মের দেশ। লক্ষ বেদনার এই দেশ। আশা-নিরাশা, হতাশা ও প্রত্যাশার এই দেশ। এই দেশ আমার প্রেরণার দেশ, চেতনার দেশ। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি, তৃপ্তি-অতৃপ্তির দেশ।

বাংলাদেশ। স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের অনেক রঙ্গীন স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে, আবার কত স্বপ্নইতো রয়ে গেছে অবাস্তবায়িত। এখানেই আমার স্বপ্নের মেলেছে ডানা। এখনও জানা-অজানা অনেক স্বপ্নের ভিড়ে আমরা বেঁচে আছি। বারবার হোঁচট খাই। তারপরও আমরা মঙ্গলের, কল্যাণের, শুভ’র স্বপ্ন দেখি। আর স্বপ্ন দেখাই আগামী প্রজন্মকে। এই অসংখ্য নাই এবং নেই এর রাজ্যে এক আকাশ স্বপ্ন দিয়ে আমরা গড়ে তুলি আমাদের ভবিষ্যত। স্বপ্ন আছে বলেই আমরা বেঁচে আছি, স্বপ্ন আছে বলেই মানুষের বেঁচে থাকার উদ্যম বেঁচে আছে। শুধু স্বপ্নের আবেশেই আমরা ভালবেসে যাচ্ছি একটি দেশকে। বাংলাদেশ আমাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার দেশ।

একদিন এরই জন্য দামাল-কিশোর ঘরের বাঁধন ছিন্ন করে শাবল-গাঁইতি হাতে তুলে নিয়ে যুদ্ধে পড়েছিল। একদিন এরই জন্য মা তাঁর সন্তানের বুকে চুমোর আলতো রেখা এঁকে চির বিদায় জানিয়ে আল্লাহর দরগায় সেজদা নত হয়েছিলেন। এরই জন্য রাতের আঁধারে গ্রামছাড়া কাফেলায় শরিক ভয়ার্ত মানুষের মিছিলে মা তার চারমাসের শিশুটিকে কাঁধে নিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটি বেরিয়েছিলেন। এরই জন্য হৃদয়ের সমস্ত আবেগ দিয়ে অসহায় গ্রাম্য মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল হায়েনার সশস্ত্র আক্রমণ। বাংলাদেশ। একটি লাল সূর্য, পূর্বের আকাশে প্রদীপ্ত ভাস্বর। এই সূর্যটিকে ছিনিয়ে আনার স্বপ্ন দেখেছেন আমাদের পূর্বসূরীরা।

দুই. যে অতীত তোমার আমার

আমি আমার অতীতের কথা বলছি। ‘আমি আমার পূর্বপূরুষের কথা বলছি-যার পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল।’ ১৭৫৭ সালে পলাশীর এই প্রান্তরে এই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত গিয়েছিল। ২৩ শে জুন মীর জাফর, ঘষেটি বেগম আর জগৎশেঠদের চক্রান্তে আমাদের পূর্বপুরুষেরা হাতে শেকল পড়েছিল। পরাধীনতার শেকল। গোলামীর শেকল। এই শেকল ছেঁড়ার গান গেয়েছিল বালাকোটের শহীদেরা। ১৮৫৭ সালে আবার আমাদের পূর্ব পুরুষের সিপাহীরা বিদ্রোহে মেতে উঠেছিল। কিন্তু ওরা পারেনি। ইংরেজদের দূর্ধর্ষ শাসনের কাছে ওরা হেরে গেছে। বিদ্রোহে মেতেছিল তিতুমীর, গড়েছিল বাঁশের কেল্লা। এদের মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েই আমাদের অগ্রজ কবির কণ্ঠের ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে… ‘কারারই লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট, রক্ত জমাট শিকল পূজার পাষাণ বেদ।’

১৯৪৭ সালে সেই পাষাণ কারার অভ্যন্তর থেকে মুক্তির লাল সূর্য ছিনিয়ে এনে আমার স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু বিদায় নেয়নি তাদের প্রেতাত্মা। আবার শাসন। আবার শোষণ। আবার বঞ্চনা। আবার গঞ্জনা। স্বপ্নের ফানুস হঠাৎই যেন চুপসে গেলো। পূর্ব-পশ্চিমের ব্যবধান বড় হয়ে দেখা দিল। হাজার মাইলের ব্যবধানকে জুড়ে দিয়েছিল যে স্বপ্ন-ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধাবোধ উর্দ্ধে তুলে ধরার স্বপ্ন – সে স্বপ্নরা হয়ে গেল উপদ্রুত। আমাদের উপদ্রুত স্বপ্নেরা আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়ালো।

আবার ডাক এলা ‘যার যা আছে তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো।’ আমাদের পূর্বপুরুষেরা জেগে উঠলো। স্বপ্ন সাহসের সম্মিলন ঘটিয়ে তারা এবার নতুন এক সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লো। এই তাদের স্বধীনতার সংগ্রাম। তারা শুনলো এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তারপর তাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। তারপর ২৫ শে মার্চের কালো রাত্রি। মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে শুরু নতুন যুদ্ধ।

আমার পিতামহ জায়নামাজে বসে হাত তুললো প্রভু, আমাদেরকে এই জালেম অধ্যুষিত জনপদ থেকে মুক্তি দাও। তার উত্তোলিত হাতের পাশে আমার পিতার মুষ্টিবদ্ধ হাত ছিল। তার চোখে অশ্রু ছলছল করছিল। তার মনে অসংখ্য স্বপ্নরা কলকলিয়ে উঠেছিল।

তার বুকের গহীনে এক আকাশ সুখের পায়রা ডানা মেলেছিল। তিনি শপথ নিয়েছিলেন – মুক্ত করবো আমার স্বদেশ প্রিয় মানুষের জন্য। আমাকে দেখে তিনি আমার জন্য একটি স্বাধীন আকাশ নির্মাণের কথা ভেবেছিলেন। আমার মা সদ্য পরীণিতা এক গাঁয়ের সরল বধূ। তার স্বামীর সাথে তিনিও হাত তুলেছিলেন। আবেগে কম্পমান তার মুখ থেকে অজান্তে বেরিয়ে এসেছে আমীন। এভাবেই আমার পিমামহ, পিতা, জন্মদায়িনী মা আর আমার স্বপ্নরা এক সরলরেখায় মিলিত হলো। আমরা সবাই মিলে রচনা করলাম মুক্তির মোহনা। লড়াইয়ের নতুন সড়ক।

তারপর সেই চলল ৯টি মাস।

টানা নয় মাসের লড়াইয়ের কথা কে না জানে?

হ্যাঁ, অনেকেই জানে না। যারা জানে তারাইবা কতটুকু জানে? ইতিহাসের কতটুকুইবা আমাদের জানানোর ব্যবস্থা হয়েছে? ইতিহাসের বিকৃতি চলছে সমানে। কোন সঠিক ইতিহাসতো আমরা আজো পাইনি।

তিন. মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও পিতার স্বপ্নভঙ্গ

শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। স্বপ্নের মুক্তিযুদ্ধ।

যুদ্ধের দামামা বাজালেন যিনি তিনি বন্দী হলেন পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে। কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলেন কিংবা কারাবন্দী হলেন। সারাদেশে মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো। যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। শহর-বন্দর-গ্রাম কোনটাই বাদ পড়লোনা।

মুক্তিযোদ্ধারা জীবনপন লড়াই করতে লাগলেন। দেশের এককেটি মানুষ গৃহছাড়া হলেন। আশ্রয় নিলেন পাশ্ববর্তী ভারতের শিবিরে। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ ও রসদ নিয়ে নতুন স্বপ্নে বিভোর হয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তারা।

যুদ্ধ হলো। ১১টি সেক্টরে, ১১ জন সেক্টর কমান্ডার। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম.এ.জি ওসমানীর নেতৃত্বে ‘আমি মেজর জিয়া বলছি, বলে যে ডাক দিয়েছিলেন এক তরুণ মেজর সেই ডাকে সাড়া দিলেন। যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝেও মুক্তিযোদ্ধার চোখে ভাসতো এক শোষণমুক্ত স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন। তারা দেখতো এই আর কটা-দিন। তারপরইতো আমরা লাল-সবুজের পতাকা খচিত এক স্বাধীন দেশের নাগরিক হবো। আমার পিতা যিনি এমনই এক স্বপ্ন দেখতে অসমবীরত্বের সাথে লড়াই করতে লাগলেন। এক যুদ্ধে ভীষণ লড়ছিলেন তিনি। হঠাৎ দেখতে পেলেন তিনি শত্রুর গোলার আওতায় এসে গেছেন। জীবনের হয়তো এটিই শেষ মুহূর্ত। স্বপ্নের ভেতর হারিয়ে গেলেন তিনি। ‘আমার মা এক হায়েনার হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে পালাচ্ছে। তাঁর কাঁধে আমি আর পেটে আমার সহোদরা। ক্লান্তি ও অবসাদকে দু’পায়ে ঠেলে গ্রামের সরল মহিলাটি হাঁটুজল ভেঙ্গে ছুটছেন আর বলছেন স্বপ্নের কথা – এইতো বাবা, আরেকটু, আরেকটু পরেই তোর বাবার কাছে যাব। তোর বাবা যুদ্ধ থেকে ফিরে তোকে আদর করবে, বড় করে তুলবে।

হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষে বাবা যেদিন ঘরে ফিরলেন সেদিন ছিল শুক্রবার। ষোলই ডিসেম্বর। দেশটা স্বাধীন হয়েছে। বাবাতো আর নিজে চলতে পারেন না। একটি ক্র্যাচে ভর দিয়ে তিনি দাওয়ায় দাঁড়ালেন।

সেখান দিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা মার্চ করে যাচ্ছে লেফট রাইট লেফট।

মিছিলের অনেক পরিচিত মুখের ভিড়ে বেশ কিছু মুখ তিনি দেখলেন। এই মুখগুলো মুক্তিযুদ্ধের কঠিন দিনে তিনি অন্য কোথাও দেখেছিলেন। বেশ নাদুসনুদুস কিছু লোককে নয় মাসই কলকাতায় থাকতে দেখেছেন। বিলাসবহুল হোটেলে মদ, মেয়ে আর নেশার স্বপ্নে বিভোর ছিল। এরাও এই মিছিলে আছে। আরো কিছু লোক দেখেছেন ওরা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনাদের সহযোগী ছিল। এখন ওদের হাতে রাইফেল। হাতে হাতে সার্টিফিকেট- ওরা মুক্তিযোদ্ধা। আমার বাবা নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না। মুক্তিযুদ্ধের একটি সার্টিফিকেট আর এক বুক নিয়ে আমার নতুন দিনের শুরু। আমার মা ছায়ার মত আমার বাবাকে আশ্রয় দিচ্ছেন। আমরা আস্তে আস্তে বড় হচ্ছি। আমার একটা নবজাতিকা বোন সাথে জুটেছে। আমাদের স্বপ্নগুলো রঙ্গিন হতে থাকলো। মুক্তিযোদ্ধা-পরিবার হিসেবে হয়তো আমরা অনেক কিছুই পাবো। শুনেছি বিদেশে মুক্তিযোদ্ধার পরিবার দেশ ও জাতির কাছ থেকে অনেক কিছুই পায়।

দিন যায় রাত আসে, রাত যায় দিন। আমাদের চোখে জাগে রঙ্গিন স্বপ্ন। রঙ্গিন স্বপ্নরা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসতে থাকে। ১০ই জানুয়ারী ১৯৭২ইং। দেশে ফিরে এসে আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন যে যাদুকর তিনি জানিয়ে দিলেন তিন বছর আমি কিছুই দিতে পারব না। তার কাছে আমরা কিছুই চাইব না এটাই বাবা মার প্রতিজ্ঞ। তিনি সরকার গঠন করলেন। সরকারের প্রতি বিদেশের স্বীকৃতি আসতে লাগলো। যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশ হিসেবে বিভিন্ন দেশ থেকে আসতে লাগলো রিলিফ সাহায্য। এরই মাত্র এক বছর আগে বন্যায় বিরাট ক্ষতি হয়েছিল আমাদের। সুতরাং সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলো। স্রোতের মত রিলিফ এলো কিন্তু মানুষ রিলিফ পেলো না। রাতের আঁধারে বাংলাদেশ থেকে সব দামী জিনিসপত্র চলে যেতে লাগলো সীমান্তের ওপারে ভারতে। বাংলাদেশটা যেনো এক হরিলুটের মাঠ। লুটে পুটে খেতে লাগলো একদল মানুষ সমস্ত দেশটাকে। রিলিফ চোরদের হাতে চলে যেতে লাগলো মানুয়ের রিযিকের অংশ। ওরা ফুলে ফেঁপে তথাকথিত বড়লোক হতে লাগলো। আর সাধারণ মানুষেরা হতে লাগলো দিন দিন নিঃস্ব। মাত্র দুই বছরের মাথায় দেশের চেহারা পাল্টে যেতে লাগলো।

আগে ছিল ২২ পরিবার। সহসাই দেখা দিলো ২২০ পরিবার। এরাই সমস্ত দেশটাকে ভাগ করে নিল। সরকার প্রধানের খেয়াল হলো দেশটিকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার। কিন্তু সোনার বাংলা গড়বেন কি দিয়ে? সোনার মানুষ গড়ার কোন আয়োজনইতো তিনি করেননি। ফলে চারদিকে অভাবের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগলো চোর, ডাকাত, হাইজ্যাকার, লুটেরা ও সন্ত্রাসীর দল। এত রিলিফ যায় কোথায়? বিদেশীরা বাংলাদেশকে বলতে লাগলো তলাহীন ঝুড়ি, bottomless basket নেতা নিজেই চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলেন সবাই পায় সোনার খনি, আমি পাইছি চোরের খনি। আমার চারিদিকে চাটার দল। সাতকোটির জন্য সাতকোটি কম্বল এসেছিল। সেই কম্বল গেলো কোথায়? দেশময় বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়লো সহসা।

চারদিকে অভাব দারিদ্র গ্রাস করলো। দেখা দিলো দুর্ভিক্ষ। পথে ঘাটে মানুষ না খেয়ে মরতে লাগলো। পেটের জ্বালায় বাবা তার সন্তানকে বিক্রি করতে বাধ্য হলো। মা তার কোলের অবোধ শিশুকে খেতে দিতে না পেরে সন্তানসহ আত্মহত্যা করলো। কাপড় কিনতে না পেরে বাসন্তীরা জাল দিয়ে লজ্জা নিবারণ করতে বাধ্য হলো। পিতা মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেটটা আগুনে পুড়িয়ে ফেললেন। উড়ে যেতে লাগলো সোনার বাংলার স্বপ্ন। উড়ে যেতে লাগলো গণতন্ত্রের স্বপ্ন।

 ক্রমেই দুঃস্বপ্নের মত আমাদের ঘাড়ে চাপতে লাগলো স্বৈরাচার ও একনায়কতন্ত্র। সবকটি পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলো। সবাইকে এক নেতা, এক দেশ এর দীক্ষা দিয়ে বাকশাল করতে বাধ্য করা হলো। পরমত সহিষ্ণুতার পরিবর্তে ভিন্নমতাবলম্বীদের পাখীর মত হত্যা করা হলো। তিরিশ হাজার জীবন দিল রাজপথে। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন ‘কোথায় সিরাজ সিকদার?’ এক অসহ্য গুমোট আবহাওয়া বিরাজ করতে লাগল সর্বত্র। আমাদের সাহসী ছড়াকাররা বাধ্য হয়ে লিখলেন-

‘ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কথা

রক্ত দিয়ে পেলাম শালার এমন স্বাধীনতা।’

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার, বাক ও স্বাধীনতা অধিকার সবকিছু বঞ্চিত মানুষ মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছিল।

এমনি সময়ে সরকার প্রধান স্বপ্ন দেখছিলেন একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে দেশকে চিরতরে পরিবারতন্ত্রের বাঁধনে বাঁধতে, আর মানুষ স্বপ্ন দেখছিলো বাঁচার মত বাঁচতে।

আবার স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। এক ভয়াল-সুন্দর রাত্রি এলো। সপরিবারে নিহত হলেন দেশ ও জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা। তার সমস্ত স্বপ্ন মাটিতে মিশে গেলো। দেশ বেঁচে রইলো, তিনি চলে গেলেন। এতবড় দোর্দন্ড প্রতাপ শাসকের মৃত্যুতে পরদিন জনতার কোন মিছিল, সমাবেশ হলো না। কেউ কাঁদলো না। বরং তাঁর কোন কোন সঙ্গী নতুন মন্ত্রীসভায় সদস্য হলেন। এভাবেই স্বপ্ন ভঙ্গ একদলের। আবার স্বপ্নে বিভোর হলো জনগণ। নতুন স্বপ্ন।

চার. প্রতিবিপ্লবীদের স্বপ্ন সমাহিত হলঃ

পঁচাত্তর এর ১৫ই আগস্ট অবিশ্বাস্য রকম এই পট পরিবর্তনে সাধারণ মানুষ এক ধরনের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নতুন সরকার দেশ গুছিয়ে আনতে না আনতে একদল সামরিক কর্মকতা একটি প্রতিবিপ্লবের প্রয়াস নেয়। সেই বিপ্লবের নায়কেরা ছিল বাকশালের প্রেতাত্মা। তাদের প্রয়াস ছিল সিপাহী বিপ্লবের মাধ্যমে বাকশালকে ফিরিয়ে আনা।

কিন্তু সে দুষ্টস্বপ্ন সফল হয়নি।

৩রা নভেম্বর এই যখন ব্যারাকের চিত্র। ৪ঠা নভেম্বর বাইরে পরাজিত দলের পলাতক নেতারা রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়ে আবির্ভূত। জনতা চিনতে ভুল করেনি ভুল করেনি সাহসী সেনারা। ৭ই নভেম্বর প্রতিবিপ্লবকে প্রতিহত করে সৈনিকরা নেমে আসে জনতার মাঝে। সাত সকালে রাস্তায় রাস্তায় উল্লেসিত জনতার মিছিল। ভয়ংকর ট্যাংকের পার্শ্বে অকুতোভয় জনতা এসে স্থান করে নিল। ফুল ছড়িয়ে দিল সৈনিকদের প্রতি। সারা ঢাকা মুখরিত হয়ে উঠলো ‘নারায়ে তাক্বীর, আল্লাহু আকবর’ ধ্বনিতে।এভাবেই সেদিন প্রতিবিপ্লবীদের স্বপ্ন সমাহিত হলো, প্রাণ ফিরে পেলো সাধারণ জনতা।

পাঁচ. বারবার দল বদলায়, বদলায় না জনতার ভাগ্যলিপি

১৯৭৭ থেকে ৮১ পর্যন্ত জনতার ভালবাসা, মমতা ও দরদ লাভ করে দেশে গড়ে ওঠে একটি জনপ্রিয় সরকার। বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে এলো, বিদেশে ভাবমূর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো, তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ বেশ গুরুত্ব পেতে লাগল। মনে হচ্ছিল আমরা যেনো আবারো স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। বড় হবার স্বপ্ন, মাথা উঁচু করার স্বপ্ন। আরবের মুসলমানরা আবার আমাদের ভাই বলতে লাগলো। আমরা ওদের পার্শ্বে বসতে লাগলাম। ১৯৮১-র ৩০ শে জুন, আবার আমাদের আকাশে কালো মেঘ দেখা দিল।

রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে গর্জে উঠলো হায়েনার অস্ত্র। সিঁড়ির পাশে পড়ে থাকলো

রাখাল প্রেসিডেন্টের নিথর দেহ। শায়কের পাষাণ হৃদয় সামান্য কম্পিত হলো না। লাখো জনতার উপচে পড়া ভিড়ের মাঝে আওলাদে রাসুল কেঁদে বুক ভাসালেন মানুষটি কেমন ছিলো? খুব ভালো ছিল। আল্লাহ তুমি তাকে কবুল করে নাও। গায়েবানা জানাজা পরিণত হলো জনসমুদ্রে। এবার একজন বিচারপতি প্রেসিডেন্ট হলেন। সুশাসনের দিকে চলছিল দেশ। হঠাৎই আমাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সেনাপ্রধানের কাছে মাথা নিচু করতে বাধ্য হলেন।

বন্দুকের নল হল তার ইচ্ছার প্রভু।

নয়-নয়টি বৎসর আমরা এক দুঃসহ স্বৈরশাসনের কবলে পড়লাম।

সেনাপ্রধান সামরিক প্রশাসক হলেন, অতঃপর প্রেসিডেন্ট হলেন। তাঁকে ঘিরে আবার কয়েকশ পরিবার তৈরী হলো। গণতন্ত্রের জন্য অনেকেই জীবন দিলো। জীবন দিলো সেলিম দেলোয়াররা। অকালে ঝরে গেলো জাফর জাহাঙ্গীর, বাকীউল্লাহ, আমীর হোসেন আর হাফেজ আব্দুর রহিমরা। হায়েনারা বুলেটে ঝাঁঝরা হলো, স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক, লেখা সাহসী যুবক নুর হোসেনের সুঠাম দেহ।

মানুষ তার শাসন, শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো।

এই তথাকথিত গণতান্ত্রিক স্বৈরাচার হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য চাপা বিক্ষোভ জেগে উঠলো সর্বত্র। সরকার প্রধান মানুষের সুপ্ত আবেগকে সঙ্গী করার ইচ্ছায় স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। এক একটি মসজিদে জুমআ পড়তে গিয়ে প্রায়ই বলতেন – কালরাত স্বপ্ন দেখলাম – আপনাদের এই মসজিদে নামাজ পড়ছি, তাই চলে এলাম। মানুষেরা চোখ ছানাবড়া করে বিস্মিত হলো। তিনি বাহবা নিয়ে চলে গেলেন। অথচ এই মসজিদে হয়তো এক সপ্তাহ ধরে সরকারী লোকেরা আনাগোনা করছিলো তার সফর সফল করার জন্য।

অবশেষে ছাত্র-জনতার নয় বৎসরের আন্দেলন সফল হলো। স্বৈরাচারের পতন হলো। বাংলাদেশ লাভ করলো একটি কেয়ার-টেকার সরকার, সম্পূর্ণ নতুন এক ধারনার।

আবারো স্বপ্নে বুক বাঁধলো মানুষ।

১৯৯১ থেকে ২০০৬। ইতিমধ্যে তিনটি নির্বাচনে ভিন্ন ভিন্ন সরকার কায়েম হলো। একবার মানুষ ভোট দিলো ধানের শীষে। জাতীয়তাবাদী সরকার কায়েম হলো। সরকার বেখেয়ালী হলে, সরকারকে নামতে হলো ক্ষমতা থেকে। আবারও কেয়ার টেকার সরকার। আবারও নির্বাচন। এবার নৌকা জিতল। ঠিক ২৩ শে জুন পলাশীতে মীর জাফরদের বিজয়ের দিনটিতে নতুন সরকার গঠন হলো। ২১ বৎসরের বুভুক্ষু নেতা-কর্মীরা রাজ্যের ক্ষুধা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো আখের গুছানোর কাজে।

দুর্নীতি, দুর্দশা ও দুষ্কর্মে ভরে উঠলো দেশ।

পাশের দেশের চানকা-বাবুদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সরকার হলো তাবেদার সরকারে। সরকার প্রধান স্বপ্ন দেখতে অস্থির হয়ে গেল। আর নতুন নতুন করে প্রকাশ পেতে থাকলো মরহুম পিতার অসমাপ্ত স্বপ্নের বয়ান। সকল বিষয়ে এত অজস্র স্বপ্ন তিনি দেখলেন আমরা একেবারে স্বপ্নাক্রান্ত হয়ে গেলাম।

অবশেষে আমাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়ে দিলো আমরা চ্যাম্পিয়ান হয়েছি। দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ান। আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে আমরা বিশ্বের দরবারে একেবারে ছোট হয়ে গেলাম। এলো ২০০১ সালের নির্বাচন। ১ অক্টোবর ঘটে গেল একটি নীরব ব্যালট বিপ্লব। ভোটারদের এক অঘোষিত লড়াই হলো নব্য স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। শেষবধি জনতার জয় হলো।

নতুন এক ফর্মুলায় তৈরী হলো জোট সরকার।

বারবার ক্ষমতার হাত বদলায়, বদলায় না সাধারণ মানুষের ভাগ্যলিপি। ৬০ মন্ত্রীর বিশাল বহর, দলীয় লোকদের উৎপাত, দেশের সকল সেক্টরে হতাশা, দুর্নীতির দুষ্ট ক্ষত – সবকিছু মিলিয়ে মানুষ খুব কষ্টে আছে। সাধারণের কষ্টে যেন আর কমতে চায় না।সাধারণ মানুষ মুক্তির স্বপ্ন দেখে, কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে যায়। চাল-ডাল-তৈল আর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশ ছুই ছুই। কোথাও সুখ নেই, শান্তি নেই। অসুখ অশান্তির কারণ নির্ণিত হলো দুর্নীতি। ঠিক দুর্নীতিই যেনো এক বড় ক্যান্সার, নীরব ঘাতক। কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে ফেলছে আমাদের। দুর্নীতির দুষ্ট ক্ষত থেকে দেশ ও জাতিকে উদ্ধারের লক্ষ্যে সরকার শক্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গা ঢাকা দিয়েছে দাগী সন্ত্রাসীরা, গড ফাদাররা। কেউ কেউ ধরা পড়েছে। আসল আসামীরা কিন্তু যথাস্থানে পালিয়ে গেছে।

এভাবে সব ক্লিন সম্ভব নয়। অথচ আজ দরকার অসংখ্য ক্লিনহার্টের, বিশুদ্ধি চিত্তের। কোথা পাব আমরা সেই বিশুদ্ধ চিত্তের মানুষদের যারা অর্থ ও বিত্তের কাছে বিক্রি যাবে না, সন্ত্রাসের কাছে মাথা নত করবে না।

ছয়. তবুও স্বপ্ন দেখি, তবুও বাঁচতে শিখি

এতো হতাশা ও দুঃখ কষ্টের মাঝেও আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে, বাঁচতে শিখতে হবে। কারণ যারা স্বপ্ন দেখেন তারা বাঁচতে শিখে না। আমরা স্বপ্ন দেখেই ক্ষান্ত হবো না। মানুষের মনে আমাদেরকে স্বপ্নের ভিত রচনা করে দিতে হবে। ১৯৬৭ সালের দুর্গত ও নিঃস্ব সিঙ্গাপুর আজ পৃথিবীতে একটি ক্ষুদ্র উন্নত দেশ। স্বপ্ন তাদেরকে বড় করেছে। মালয়েশিয়ার মানুষেরা সর্বত্র ও নিঃস্ব সিঙ্গাপুর আজ পৃথিবীতে একটি ক্ষুদ্র উন্নত দেশ। স্বপ্ন তাদেরকে বড় করেছে। মালয়েশিয়ার মানুষেরা সর্বত্র হৈ চৈ করছে তাদের নতুন স্বপ্ন নিয়ে। স্বপ্ন ও স্বপ্ন বাস্তাবায়নের সংকল্প ইতোমধ্যেই তাদেরকে অনেকদূর এগিয়ে দিয়েছে। এখনও তারা স্বপ্ন দেখে দুয়ো পুলো, দুয়ো পুলো অর্থ্যাৎ ২০২০। দুই হাজার বিশ সাল। দুই হাজার বিশ সাল। দুই হাজার বিশ সালের মাঝে শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে তারা পৃথিবীর নেতৃত্ব নিয়ে নিতে চায়। গায়ের জোরে নয়, অসির বলে নয়, মেধা ও মসির বলে তারা পৃথিবীকে সামনে এগিয়ে নিতে চায়।

এই যে স্বপ্ন, এই যে বড় হওয়ার তাগিদ এটাই আমাদের চলার পাথেয়। ওদেরও তাই। একটি পৃথিবী নষ্ট হয়ে গেছে -আরেকটি নতুন পৃথিবী গড়বার জন্য যে উদার হৃদয় ও গভীর প্রয়োজন সেটি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে তরুণ প্রজন্মকে।

আমাদের স্বপ্ন দেখি। অজস্র স্বপ্নের বিড়ে আমরা সৃষ্টিশীলতার মাঝে হারিয়ে যাই।

তরুণেরা, এসো-আত্মগঠনের স্বপ্ন। নিজেকে গড়া মানেই মানব সভ্যতার বিশাল ইমারতের একটি ইটকে ঠিকমত গেড়ে দেয়া। আমাদের স্বপ্ন-পরিবার গঠনের স্বপ্ন। মা-বাবা, ভাই-বোনসহ সকল আত্মীয় স্বজনকে নিয়ে আমরা গড়বো এক একটি শিক্ষিত পরিবার, সৎ পরিবার, সাহসী পরিবার। কারণ এই পরিবারগুলোই সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব ব্যবস্থার একক।

আমাদের স্বপ্ন-সমাজ গঠনের, সমাজ বদলের স্বপ্ন। ঘুণে ধরা সমাজকে ভেঙ্গে নতুন এক সমাজ গঠনের স্বপ্ন।

আমাদের স্বপ্ন-একটি দেশ রাষ্ট্রে গঠনের স্বপ্ন। আশা ও সৃজনশীলতায় ভরা একটি দেশ গড়বো আমরা।

এই যে দেশ, এই যে মাটি, ৬৫০০০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তীর্ণ সবুজের এই যে সমারোহ। এটিই আমাদের সেই স্বপ্নের সাহসী ঠিকানা। এই ঠিকানায় জড়ো হই, জেগে উঠি সৃষ্টি কল্যাণ ও উন্নতির নতুন উদ্যম নিয়ে আগুনের ফুলকিরা এসো জুড়ো হই দাবানল জ্বালাবার মন্ত্রে, বজ্রের হুংকারে আঘাত হানি মিথ্যার সব ষড়যন্ত্রে।

এই যে স্বপ্ন, এই যে বড় হওয়ার তাগিদ এটাই আমাদের চলার পাথেয়। ওদেরও তাই। একটি পৃথিবী নষ্ট হয়ে গেছে -আরেকটি নতুন পৃথিবী গড়বার জন্য যে উদার হৃদয় ও গভীর প্রয়োজন সেটি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে তরুণ প্রজন্মকে।

আমাদের স্বপ্ন দেখি। অজস্র স্বপ্নের বিড়ে আমরা সৃষ্টিশীলতার মাঝে হারিয়ে যাই।

তরুণেরা, এসো-আত্মগঠনের স্বপ্ন। নিজেকে গড়া মানেই মানব সভ্যতার বিশাল ইমারতের একটি ইটকে ঠিকমত গেড়ে দেয়া।

আমাদের স্বপ্ন-পরিবার গঠনের স্বপ্ন। মা-বাবা, ভাই-বোনসহ সকল আত্মীয় স্বজনকে নিয়ে আমরা গড়বো এক একটি শিক্ষিত পরিবার, সৎ পরিবার, সাহসী পরিবার। কারণ এই পরিবারগুলোই সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব ব্যবস্থার একক।

আমাদের স্বপ্ন-সমাজ গঠনের, সমাজ বদলের স্বপ্ন। ঘুণে ধরা সমাজকে ভেঙ্গে নতুন এক সমাজ গঠনের স্বপ্ন।

আমাদের স্বপ্ন-একটি দেশ রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন। আশা ও সৃজনশীলতায় ভরা একটি দেশ গড়বো আমরা।

এই যে দেশ, এই যে মাটি, ৬৫০০০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তীর্ণ সবুজের এই যে সমারোহ। এটিই আমাদের সেই স্বপ্নের সাহসী ঠিকানা। এই ঠিকানায় জড়ো হই, জেগে উঠি সৃষ্টি কল্যাণ ও উন্নতির নতুন উদ্যম নিয়ে আগুনের ফুলকিরা এসো জুড়ো হই দাবানল জ্বালাবার মন্ত্রে, বজ্রের হুংকারে আঘাত হানি মিথ্যার সব ষড়যন্ত্রে।