জ্বলে ওঠো সাহসের মন্ত্রে

লেখকঃ আবু জাফর মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ

এক টুকরো আলো:

আমরা প্রতিদিন সকালে সূর্য দেখি। সূর্যের লাল আভা বিদায় হওয়ার সাথে সাথে চারিদিকে কোলাহল বেড়ে ওঠে, সবুজ প্রকৃতি আলোর ছোঁয়ায় হেসে ওঠে। পাখিরা কিচির মিচির শব্দে জাগিয়ে তোলে ঘুমের পাড়া। প্রকৃতির এটাই নিয়ম। পৃথিবী থেকে ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল দূরে থাকা সূর্য আমাদের জন্য আলোর প্রধান উৎস। কিন্তু যখন ক্রমাগত বহুদিন সূর্য দেখা যায় না, যখন ঘুটঘুটে অন্ধকার আমাদের ছেঁয়ে থাকে তখন? তখন আমরা আলোর বিকল্প উৎস খুঁজি।

তোমরা নিশ্চয়ই জানো মানব সভ্যতার উন্মেষ বা জন্ম হয় আলোর পরশে, আগুনের ছোঁয়ায়।আজ আমরা বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে বসবাস করছি। সেই যে আদিম যুগ, সুবাতাসের যুগ, পাথর দিয়ে শিকার করার যুগ, পাথরে পাথর ঘষে আগুন তৈরীর যুগ সেটি বিদায় নিয়েছে অনেক আগে। তারপর আমরা লৌহ যুগ, তাম যুগ, বিদ্যুতের যুগ পার হয়ে এখন অতিক্রম করছি আনবিক যুগ, তথ্য প্রযুক্তির যুগ। এখন আমরা ঘরে বসে দেখতে পাই দশ হাজার মাইল দূরে বাস করা প্রিয় স্বজনকে, এক মূহূর্তে। বিজ্ঞান যতই সামনে থাকুক না কেন আগুন আলোর ব্যবহার করছে না? যেনো যুগ-যুগান্তরের সভ্যতার নিত্য সারথী এই আলো।

খুটখুঁটে গহীন অরণ্যের গুহাবাসী মানুষ খাবার তৈরী করার তাপ, আলোর উৎস হিসেবে প্রথমেই আগুন তৈরি করতে শিখে। সেই অগ্নি শিখাই সভ্যতার প্রথম প্রকাশ। এক কথায় টুকরো আগুন তার শিখা ও আলোর মধ্যে দিয়েই সভ্যতার জন্ম।

এই আগুন আর আলোর সর্বাধুনিক রূপ হচ্ছে জ্ঞান। আজ জ্ঞানের অগ্নিশিখায় পথ চলে মানুষ পৃথিবীর সীমা অতিক্রম করার মহাবিশ্বে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চাঁদে আজ সকলে সে খুঁজে ফিরছে নতুন জীবন ও সভ্যতাকে।

এটাকেই আমাদের স্রষ্টা রাব্বুল আলামীন এক কথায় বলেছেন ইকরা, বিইস্মি রাব্বিকাল্লাজি খালাক। “পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।” পড়ো তার নামে যিনি তোমাকে শিখিয়েছেন তা, যা তুমি জানতে না।

এই জ্ঞানটাই সভ্যতার আলো। এই আলোই আমাদের পথ চলার সবচেয়ে বড় পাথেয়। এ নিশ্চয়ই আজ আমাদের কথা।

জ্বলে ওঠার মন্ত্র:

তোমরা নিশ্চয়ই তুষের আগুন দেখেছ বা সে সম্পর্কে শুনেছো! বিশেষ করে বর্ষাকালে বা শীতকালে মাটির পাত্রে তুষ বা ছাইয়ের আড়ালে আগুন চাপা দিয়ে রাখা হয়। যখন আগুন জ্বালাতে হয় তখন ছাই চাপা তুষে ফুঁ দিলেই আগুন জ্বলে ওঠে। সব মানুষের সেই রকম সুপ্ত (latent) প্রতিভা (Talent) বা উত্তাপ (Heat) থাকে। চাপা থাকতে থাকতে এসব হারিয়ে যায়। কিন্তু, একটু নেড়ে দিলে, একটু উসকে দিলে, একটু সুযোগ করে দিলেই এসব সুপ্ত প্রতিভা পূর্ণোদ্যামে জেগে উঠে। একটু আলোর পরশেই যেনো এরা হয়ে উঠে আলোকিত।

কিন্তু কোথায় পাবে এই পরশ পাথর? পরশ পাথর বলতে কিছু কোন কালে কেউ দেখেনি। এটি একটি কল্প কথা। কিন্তু মানুষের মাঝে কিছু অসাধারণ মানুষ থাকে যাদের সংস্পর্শ পেলে অন্যরা জ্বলে ওঠে। সুন্দর হয়, আলোকিত হয়, উদ্ভাসিত হয়। ফলে যে কেউ তাদের সান্নিধ্যে প্রভাবিত, আলোকিত ও উজ্জ্বল হয়। তাই এরকম মানুষকে অনেকেই পরশ পাথর বলে থাকেন। এদের পরশে মানুষ হয় খাঁটি, মানুষ পরিণত হয় খাঁটি সোনায়।

কি থাকে তাদের কাছে? কোন আলৌকিক মন্ত্র? কোন অসাধ্য সাধন প্রক্রিয়া?

যে জ্বলতে শেখে, সে জ্বালাতেও শেখে:

জ্বলে জ্বলে মোম সবাইকে আলো দেয়, নিজে নিঃশেষ হয়েও অন্যদের আলোকিত করে। মোম আলো দিয়েই শেষ হয়ে যায় না। তার আগুন দ্বারা অন্যরাও জ্বলে ওঠে। আলোকিত মানুষ তারই মতো। সে নিজে জ্বলে এবং অন্যদের জ্বলে ওঠতে সাহায্য করে। কিছু কিছু মানুষ না নিজে জ্বলে না অন্যকে জ্বলতে সাহায্য করে। এরা প্রতিদিন আকাশে সূর্য উঠতে দেখে, আলো জ্বলতে দেখে। কিন্তু সূর্যের মতো তারও যে জ্বলে ওঠা দরকার এটুকু তারা বোঝেনা। এদের বলা হয়েছে গাফিল বা বেখবর। কোরআন এদের সম্পর্কে বলেছে: এরা দেখেও দেখেনা, শুনেও শুনেনা, বুঝেও বুঝেনা। এসব মানুষ দিয়ে পৃথিবীর কোন কল্যাণ সম্ভব নয়। যে জ্বলতে পারে, জ্বলতে শেখে, সে জ্বালাতেও পারে। এজন্য প্রত্যয় নিতে হবে তোমার আপন শক্তিতে আগে জ্বলে ওঠতে হবে। তুমি জ্বলে ওঠলেই তোমার দীপ্ত আলোয় অন্যরাও উদ্দীপ্ত হবে, জ্বলে ওঠবে। তোমার একার আলোতে অসংখ্য মানুষ ও পরিবেশ আলোকিত হবে।

আমরা কোথায় শিখি কি করে শিখি:

মানুষ জন্মসূত্রে শিখে আসেনা। সকল প্রাণীর মতো আমরাও কিছু বৈশিষ্ট্য, সীমাবদ্ধতা নিয়ে জন্ম লাভ করি। মানুষ ছাড়া আর কোন প্রাণীর জন্য শিখার বিশেষ ব্যবস্থা নেই। তার শিখা, লিখা পদ্ধতি নেই। সাপের বাচ্চা ডিম থেকে ফুটলেই ফণা তুলতে শিখে, গরু বাছুরের জন্মের পরপরই লেজ তুলে দৌড়াতে পারে, এগুলো জন্মসূত্রে পাওয়া (Built in)। মানুষকে কিন্তু আস্তে আস্তে সব শিখতে হয়।

আমাদের অর্থাৎ মানুষদের শেখার প্রথম জায়গা পরিবার, প্রথম শিক্ষক ‘মা’। তাছাড়া পরিবারের বাকী সব সদস্যের কাছ থেকেও আমরা শিখি।

একজন মানব শিশু প্রথমে দেখে, শুনে এগুলো সে বলতে পারেনা। চারিদিকের লোকজন কি করে, কেমন করে, কাকে কি নামে ডাকে, কি বলে কিছু পায় ইত্যাদি সব বিষয় সে দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে তার স্মৃতিতে সেগুলো স্থায়ী হয়ে যায়। আমরা দেখি হঠাৎ সে মা মা করে ডেকে উঠছে। কিংবা দা, দা বলে শব্দ করছে। সে খাবারের নাম মুখে আনছে। পানিকে সে মাম্ মাম্ বলে বুঝাচ্ছে। এভাবে ধীরে ধীরে সে পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে প্রাকৃতিকভাবেই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অনেক কিছুই শিখে। এটাকে আমরা বলি learning by observing being a part of the society সমাজের একজন দেখে, পর্যবেক্ষণ করে আস্তে আস্তে শিখে।

এছাড়া কেবল মানব সমাজেই পড়ালেখা শেখানোর আলাদা আয়োজন রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা (Formal education), উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা (non-formal education) এবং অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা (informal education)। সমাজ-সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে ধীরে ধীরে জ্ঞান চর্চার বিভিন্ন আয়োজন গড়ে ওঠে। বর্তমানে সরকারি, বেসরকারি, সামাজিক, পারিবারিক উদ্যোগে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব না থাকলে তোমরা বা আমরা যে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে পড়ালেখা শিখছি, ডিগ্রি অর্জন করছি- হয়ত এসব কিছুই হতোনা। আমরা দেখছি সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে আমাদের জন্য শিক্ষা নানা রকম আয়োজন বাড়তে শুরু হয়েছে। আগে আমরা মক্তবে না গেলে কোরআন শিখতে পারতাম না, এখন ঘরে বসে online এ তুমি তা শিখতে পারছো। আগে পড়তে হলে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে হতো, কিন্তু এখন online university-তেও ডিগ্রি নেয়া যায়। যাই হোক শেখার জন্য মানুষের নানা আয়োজন।

মানুষের আয়োজন থেকে যে শিক্ষা তাকে আরেক কথায় বলা হয় পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষা। এ পদ্ধতিতে অর্জন করা জ্ঞানকে বলে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান (experimental knowledge)। জ্ঞান সবসময় স্থির নয় পরিবর্তনশীল। জ্ঞানের আরেকটি উৎস হচ্ছে অহি বা প্রত্যাদেশ। স্রষ্টা এ জ্ঞানের মূল উৎস। নবী ও রাসুলদের মাধ্যমে তিনি মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্য জ্ঞান প্রেরণ করেন। এ জ্ঞান স্থির, অপরিবর্তনশীল। একে বলা হয় অহিলব্ধ জ্ঞান।

শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ:

সভ্যতার সৃষ্টি মৌলিক উপাদান। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি হলো শিক্ষা ব্যবস্থা (education system) জাতি বা রাষ্ট্র গড়ে ওঠার জন্য সেখানকার মানুষদের চিন্তা, চেতনা, মন, মনন ও সঠিক উন্নতির জন্য শিক্ষার আয়োজন গড়ে তোলা হয়। আলোচনা ভাল করে বোঝার জন্য আগে মানুষের দিকে একটু তাকাও। প্রতিটি মানুষের তিনটি স্বত্তা আছে। আর তা হলো শরীর (body), মন (mind) এবং আত্মা (soul)। শরীর বাড়ার সাথে সাথে আমাদের মনকেও বাড়াতে হবে, মন শুদ্ধ হতে হবে। আবার তার সাথে সাথে বাড়াতে হবে জ্ঞান। তা হতে হবে বিকশিত, পরিশীলিত ও পরিশুদ্ধ।

এজন্য দেশে দেশে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম অংশ হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম (Curriculum), সহশিক্ষা কার্যক্রম (Co-Curriculum) এবং শিক্ষা কার্যক্রম বহির্ভূত (extra curriculum)বিষয় সমূহ। কারিকুলাম দেশ ও জাতির প্রয়োজনের আলোকে নির্ধারিত হয়। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের একজন শিশুর হাতে থাকতো বাল্য শিক্ষা। খেলতে খেলতে দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে শিক্ষার আয়োজন।

শিক্ষার অনেক সংজ্ঞা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন। “মানুষকে মানুষ করার আয়োজনের নাম শিক্ষা।” আবার ইংরেজ কবি জন মিল্টন বলেছেন “Education is the harmonious development of body, mind and soul” মানুষের দেহ, মন ও আত্মার সুসামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশের নাম শিক্ষা।

তাই আজ সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে শিক্ষারও বিকাশ এবং বৃদ্ধি ঘটছে। একজন মানুষ শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত যত পড়ালেখা করে তার উদ্দেশ্য থাকে মানুষটির সমস্ত দিকের সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করা। তার দেহের দিকে খেয়াল রাখা হয় প্রথম। তাকে খাবার খেতে বলা হয়, দেয়া হয়। খেলাধুলা, ব্যয়াম, শরীর চর্চা, দৌড় ঝাঁপ, সাঁতার ইত্যাদিতে তাকে অভ্যস্ত করা হয়। কারণ সবল দেহ সুস্থ মন। আবার বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে মানুষকে গল্প কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে মনের নানা বিষয়ের সাথে পরিচিত করা হয়। তার মধ্যে মানসিক স্ফুরণ ও বিকাশ ঘটে। তা ছাড়া তার পরিচয় হয় নৈতিকতা (morality) এবং ধর্মের সাথে।

মানুষের আত্মার বিকাশ হয় ধর্মের (religion) সান্নিধ্যে ধর্ম তাকে সত্য বলতে, মিথ্যা পরিহার করতে, মানব দরদী হতে সাহায্য করে। ধর্ম তাকে পাপ ও অন্যায়কে ঘৃণা করতে শিখায়, পূর্ণ্য ও ন্যায়ের উপর টিকতে উদ্বুদ্ধ করে। একথাটিকে একজন ইংরেজ দার্শনিক Sir Stainly Hall সুন্দর করে বলেছেন। তাঁর ভাষায় “If you teach your son 3rd i-e Reading, writing and Arithmatic and don’t teach him the 4th R i.e Religion’ definitely you will get 5th R, i.e Rascality” যদি আপনি আপনার সন্তানকে তিনটি ‘R’ অর্থাৎ পড়ন, লিখন ও অঙ্ক শিখান এবং চতুর্থ ‘R’ অর্থাৎ ধর্ম না শিখান তাহলে নিশ্চিত আপনি পাবেন পঞ্চম ‘R’ অর্থাৎ বর্বরতা (Rascality)।

মানব সভ্যতার এমন বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা এক বাস্তবতা দেখতে পাই।

আজ আমরা যারা ছাত্র ও শিক্ষক, যারা শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে জড়িত তাদেরকে বিষয়গুলো ভাল ভাবে বুঝতে হবে। অবশ্য ছাত্র-ছাত্রীদের বাবা মায়েদেরও তা বুঝে নিতে হবে। তা না হলে আমরা কেউ কেউ হয়ে উঠবো কেবল গ্রন্থকীট (Book worm), কেউ হয়ে উঠবো কেবলমাত্র ডিগ্রীধারী মানুষ। আমরা হয়ে উঠবো কেবল অহংকারী কিঞ্চিত বর্বর।

এ পর্যায়ে আমরা ছাত্র ও শিক্ষকের কাংখিত মান নিয়ে কিছু কথা ভাগাভাগি করবো।

ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক:

ভাল শিক্ষার দাবী হচ্ছে শিক্ষকের ভাল সম্পর্কে। মা বাবা সম্পর্কে জন্ম দেন, তাকে অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন, তাকে ভাল হয়ে থাকার ব্যবস্থা করেন। আর শিক্ষক পরম মমতায় এই শিশুটাকে ধীরে ধীরে একজন সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজটি করেন। তিনি তার ভেতরে জানার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলেন, তার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান তাকে প্রদান করেন ও শিখান। একটি নিদ্দিষ্ট সময়ের জন্য ছাত্র-শিক্ষক নির্দিষ্ট আয়োজনে নিদ্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে একত্রিত হন। এর বাইরে শিক্ষক ছাত্রের ভাল-মন্দ উন্নতি নিয়ে সময়ে সময়ে তার অভিভাবকের সাথে আলাপ আলোচনা (Counseling) করেন। একজন শিক্ষক মূলত: একজন ছাত্রের (Friend, Philosopher and guide) বন্ধু, দার্শনিক ও পদপ্রদর্শক।

ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কই বলে দেয় জাতি তাদের কাছ থেকে কি পাবে।

ইংরেজি Student এবং Teacher শব্দ দুটোকে বিস্তারিত রূপে ব্যাখ্যা করে আমরা ছাত্র ও শিক্ষকের কাংখিত মান সম্পর্কে বুঝতে পরি।

Student :

S – Study – অধ্যয়ন। অধ্যয়ন ছাত্রদের প্রথম ও প্রধান কাজ। বলা হয় ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ। ছাত্রের প্রধান কাজ হচ্ছে অধ্যয়ন, পড়ালেখা করা। প্রতিটি ছাত্রকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ক্লাস করতে হবে। ক্লাসে তিনটি কাজ। উপস্থিতি (Attendance), মনোযোগ দিয়ে শিক্ষকের দেয়া পাঠ গ্রহণ করা (Attention) এবং ক্লাসে শিক্ষকের সঠিক উত্তরদান (Performance)। এ তিনটি কাজ সঠিকভাবে হলে ক্লাসে ভাল ফলাফল করা সম্ভব। ফুটবল খেলায় যেমন গোল দেয়াটা সাফল্যের মানদন্ড, তেমনি ক্লাসে ভাল নাম্বার বা গ্রেড পাওয়া সেখানকার সাফল্য।

তাকে এজন্য ক্লাসের বাইরেও লাইব্রেরীতে ও বাড়িতে পাঠ্য বই পড়তে হয় প্রচুর। নোট করতে হয়। ব্যাপক লিখতেও হয়। অনেকই দ্রুত লিখতে না পারার কারনে নির্দিষ্ট সময়ে সব প্রশ্নের সঠিক ও মানের উত্তর দিতে পারে না। ফলে তার জীবনে আসে ব্যর্থতা বা Failur.

T-Truthfulness- সত্যবাদিতা। যে সদা সত্য কথা বলে সে সদাই বিজয়ী হয়। মিথ্যা বলা পাপ। বলা হয় মিথ্যা সকল পাপের মা। একটি মিথ্যা কথাকে ঢাকতে হলে কমপক্ষে ১০০টি মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। সত্যবাদী মানুষের জীবনে ভয় ও পরাজয় আসেনা। ছাত্র-ছাত্রীরা ছোট বেলা থেকে সত্য বলতে বলতে জীবনের সকল জায়গায় সত্যর উপর টিকে থাকতে শিখে। আমরা মিথ্যাবাদীকে কেউই বিশ্বাস করি না। আবার সত্যবাদি বালক বায়েজিদ ও আব্দুল কাদের জিলানীর গল্পও সবার জানা। মিথ্যার সাময়িক জয় হলেও চূড়ান্ত বিজয় কিন্তু সত্যের। কোরআনে বলা হয়েছে “আর সত্যের সমাগত মিথ্যা অপসৃত সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী”।

U- Unity- ঐক্য। ছাত্র জীবন থেকেই সবাইকে ঐক্যের গুন অর্জন করতে হবে। সকল ভালো কাজে ঐক্যবদ্ধ হয়ে করতে হবে। সবাইকে নিয়ে চলতে শিখতে হবে। জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ না থাকতে পারলে যেমন জাতি পিছিয়ে পড়ে তেমনি মানুষ হিসেবে ঐক্যবদ্ধ না থাকলে পরিবারও পিছিয়ে পড়ে। আমরা জানি দশের লাঠি একের বোঝা। বৃদ্ধ ও তার সন্তানদের গল্প সবারই জানা। একটা কঞ্চি। যে কেউই ভেঙে ফেলতে পারে কিন্তু এক সাথে দশটা কঞ্চির গোছা কেউই এককভাবে ভাঙতে পারে না। এজন্য বলে একতাই শক্তি একতাই বল। একা যে সেই দুর্বল। দশীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে একতাবদ্ধ থাকা যায়।

D- Discipline – শৃংঙ্খলাবোধ। প্রতিটি ছাত্র সব সময় শৃংঙ্খলাবদ্ধ জীবন যাপন করতে শিখে। তাকে ব্যক্তি জীবনেও শৃংঙ্খলাবোধে চলতে হয়। দিনশেষে সবকাজ গুছিয়ে সকাল সকাল ঘুমতে হয়। আবার অতি প্রত্যুষে কাক ডাকা ভোরে জাগতে হয়। ইংরেজীতে যেমন বলা হয় Early to bed and early to rise, is the way to be healthy, wealthy and wise. নিজের বিছানাপত্র, বই পুস্তক, কাপড় চোপড় সব কিছু সুন্দর করে গুছিয়ে রাখার মধ্যে একটা আনন্দ আছে। আমরা তার প্রশংসা করি। সময়মতো পড়াশোনা, সময়মতো খেলাধুলা, সময় মতো বিশ্রাম, সময়মতো খাওয়া দাওয়া-এটাই হলো শৃংঙ্খলা মেনে চলার লক্ষণ। প্রতিটি ছাত্র সময়মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাবে। নিয়ম মেনে হাজিরা দেবে। শ্রেণি কক্ষে নিয়ম মেনে চলবে- তাহলে সবাই তাকে ভালবাসবে।

মোটকথা আমাদের জীবনকে সুন্দর করতে হলে শৃংঙ্খলার কোন বিকল্প নেই। সেজন্য বলা হয় শৃংঙ্খলাই জীবন; বিশৃংঙ্খলাই মরণ। আমরা যেনো শৃংঙ্খলা ভঙ্গ করে অনিয়ম ও বিশৃংঙ্খলার জীবন যাপন করে অসময়ে মরণ বরণ না করে বসি।

E- Enthusiasm – উদ্দীপনা দিয়ে কবি নজরুলের একটা গান আছে। ছাত্রদল। তিনি লিখেছেন আমরা শক্তি আমরা বল/ আমরা ছাত্রদল, মোদের পায়ের তলায়, মুছে তুফান/ উর্ধ্বে বিমান ঝড়বাদল।’ ছাত্রমানে শক্তির প্রতীক, উদ্যম ও উদ্দীপনার প্রতিক। মরা, ম্রিয়মান মানুষ কখনো উদ্দীপ্ত করতে পারে না। তাই ছাত্র হিসেবে আমাদেরক সকল ভালো কাজে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। খেলাধুলাসহ শিক্ষা কার্যক্রম এমনকি বাইরের জগতের ভালকাজ সমূহ সব ক্ষেত্রেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

N- Nobility – মহত্ব। ছাত্রজীবন থেকেই আমাদেরকে মহৎ গুণের অধিকারী হতে হবে। আত্ম-কেন্দ্রিক না হয়ে সবার জন্য করতে হবে। সব মহৎগুণগুলো অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। মানুষের জন্য হলেও করতে হবে। অন্যের দুঃখে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। ছোটখাট বিষয়ে মানুষকে ছাড় দিতে হবে। নিজের দোষ বড় করে দেখতে হবে। অন্য কেউ ভুল বা দোষ করলে তাকে/তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে হবে। ক্ষমার চেয়ে মহৎ কোন গুণ নেই।

T- Trustworthiness- বিশ্বস্থতা। এখনকার দিনে কাউকে বিশ্বাস করাই দায়। মানুষ নিজকেই নিজে বিশ্বাস করতে চায় না। অন্যকে বিশ্বাস করাতো সে অনেক দূরের কথা। ছাত্র হিসেবে আমাদেরকে এই দুর্লভ গুণটি অর্জন করতে হবে। যে বিশ্বস্ত হতে পারে সে মানুষের ভালবাসাও পায়।

এভাবে ছাত্র হিসেবে আমরা যদি উপরের গুণগুলো অর্জন করতে পারি তাহলেই আমরা পারবো একটি সুখি সমৃদ্ধশালী সমাজ গড়তে। আমরা যেনো সমাজ নামক দালানের এক একটি ইট। প্রতিটি ইট যদি সুন্দর, শক্ত ও মজবুত হয় তাহলে আমাদের সমাজটিও হবে উত্তম, সুদৃঢ় ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য।

শিক্ষক: Teacher

ছাত্রদের যেমন অনেক নিয়মকানুন মেনে নিয়ে ভাল ছাত্র হতে হবে, তেমনি একটি ভাল জাতির কারিগর হিসেবে আমাদের সম্মানিত শিক্ষকদেরও হতে হবে অনুকরণীয়। আদর্শ মানুষ ও শিক্ষক। এটিকে আমরা আগের মতো আলোচনা করছি। যারা আগামী দিনের দেশ ও সমাজ গড়ার কারিগর হতে চায় এটি তাদের অনেক কাজে লাগতে পারে।

T- Truthfulness – সত্যবাদিতা। শিক্ষক সত্যবাদি না হলে সাধারণত ছাত্র সত্যবাদি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। সে কারণে শিক্ষককে হতে হবে একনিষ্ঠ’ সত্যবাদি একজন মানুষ। তিনি মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেবেন না, জীবন বিপন্ন হলেও সত্যের উপর অবিচল থাকবেন।

E- Encouraging – উৎসাহদাতা। একজন শিক্ষক সবসময় ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনে প্রনোদনা ও উৎসাহ যোগাবেন, তাদেরকে ভাল কাজ করতে। সাহসের কাজ করতে এগিয়ে দেবেন। ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বড় হতে শেখে। একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্য বিষয়ে নয় জীবনের সকল দুঃসাহসিক কাজে তাদেরকে উৎসাহিত করে থাকেন। এতে করে তার সাফল্য। তার এই মহৎ চেষ্টা ছাত্র-ছাত্রীদের বুকে সাহস, মুখে ভাষা আর চলার পথে গতি দান করে থাকে।

A- Admiring – বিস্ময়কর। শিক্ষক মানুষ হিসেবে, চলনে বলনে, পোষাকে-আশাকে, চরিত্র মাধুর্যে হবেন এক বিস্ময়কর মানুষ। তাঁকে দেখলেই ছাত্র-ছাত্রীর চোখ আনন্দে বড় হয়ে উঠবে। মন অজানা আনন্দে ভরে উঠবে। তাঁর যেমন থাকবে হৃদয় উজাড় করা আদর, স্নেহ, ভালবাসা তেমনি থাকবে সময়মত দৃঢ় শাসনের মনোভাব। সেই যে বিখ্যাত কথা “শাসন করা তারই সাজে, সোহাগ করে যে।” এটি একজন শিক্ষকের জন্য সব সময় প্রযোজ্য হবে।

C- Caring – যত্নবান। একজন শিক্ষকের কাছে ছাত্র হচ্ছে আমানত। অতি যত্নে তিনি তাঁকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন। তার পাঠ্য বইয়ের পড়া থেকে শুরু করে সকল কার্যক্রম স্থির করার ক্ষেত্রে শিক্ষকের অনেক ভূমিকা থাকবে। একজন ছাত্র বার্ধক্যে এসেও বলতে হবে হ্যাঁ, আমার এই শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের তুলনাহীন যত্নের কারণেই আজ আমি এ অবস্থায় আসতে পেরেছি।

H- Honest – সৎ। একজন শিক্ষক হবেন আগাগোড়া একজন সৎ মানুষ। জীবনে কোথাও, সততার বিপরীত কোন কাজ তিনি করবেন না। সকল অসৎ প্রবৃত্তি থেকে তিনি বেঁচে থাকবেন। তাঁর জীবনের মূলনীতি হবে একটাই “Honesty is the best policy” সততাই তাঁকে সুখীরাখে। ভাল শিক্ষকরা স্বাস্থ্য সচেতনও হয়ে থাকেন। এক কথায় তিনি Honesty, happy and healthy.

E- Empowered -ক্ষমতাপ্রাপ্ত। একজন শিক্ষক কেবল দায়িত্বপ্রাপ্তই হবেন না। তিনি কিছু ক্ষমতাও হাতে রাখবেন। আমাদের দেশে দায়িত্ব ও ক্ষমতা পাশাপাশি অর্পিত হয় না বলে ছাত্রদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেকেই ভাল ভূমিকা রাখতে পারে না। শিক্ষাগুরু হিসেবে তাদেরকে সঠিক মর্যাদা ও ক্ষমতা প্রদান করা উচিত। এক্ষেত্রে স্মরণীয় হলো ‘ওস্তাদের কদর’ কবিতাটি। শিক্ষকদের কিছুটা emotional’s হতে হয়।

R- Rewarding -পুরষ্কার প্রদানে অভ্যস্থ। শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের যেকোন অর্জনে আনন্দিত হবেন। তাদেরকে পুরস্কৃত করবেন, উৎসাহিত করবেন। ছাত্র-ছাত্রীদের আনন্দ যেনো তাঁরই আনন্দ। আবার একইভাবে শিক্ষক হবেন reminder প্রদানকারী, বারবার তাদের ভালমন্দ বিষয়ে সতর্ক করবেন।

শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে জ্বালো:

পৃথিবীর সব দেশে, সব অঞ্চলে ধীরে ধীরে শিক্ষার বিস্তার ঘটছে। সব খানেই শিক্ষার হার (rate of literacy) বেড়ে চলছে। বাংলাদেশে এক সময় শিক্ষার হার কম ছিল। বিগত কয়েক দশক ধরে নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে সরকারী, বেসরকারী, পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ের ব্যাপক শিক্ষা বিস্তার কর্মসূচীর কারণে এখন পুরুষ ও নারীদের মাঝে শিক্ষার হার বাড়ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষার হার বেড়ে হয়েছে প্রায় ৮৩%। আমাদের শিক্ষার হার বলতে বুঝানো হয় যারা নাম দস্তখত করতে পারেন তাদের হারকে।

কেবল নাম দস্তখত করতে পারা মানুষকে অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন বলা যায়। ঠিক শিক্ষিত বলা যায় না, যথার্থভাবে আলোকিত বলা যায় না। আবার কেবল ডিগ্রীওয়ালা মানুষকেও বলা যায় না সঠিক মানের শিক্ষিত মানুষ। আগে আমরা শিক্ষিত বর্বর কথাটি আলোচনা করেছি। ডিগ্রী বা পড়াশুনা যদি কারো আচার আচরণকে পাশবিকতার হাত থেকে বের করে আনতে না পারে সে মানুষ ডিগ্রীধারী কিন্তু ‘মানুষ’ নয়। তাঁর ভেতর প্রকৃত জ্ঞান (Knowledge) এর বিকাশ ঘটেনি, উন্মেষ হয়নি।

আজ ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো জ্বালাবার দিন। এক সময় ছিলো ‘মাষ্টার সাব, আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই, কেউ যেনো কোন দিন বলতে না পারে তোমার ছাত্রের বিদ্যা নাই….. মাষ্টার সাব। “আজ সময় হয়েছে নতুন করে ভাবনার। আগে ছিলো, “লেখাপড়া করে যে, গাড়ীঘোড়া চড়ে সে, জ্ঞানীজনে বন্ধে, মুর্খ যারা, শুধুই তারা পড়ে গাড়ির তলে।” ক্রমশ সে কথাও বদলে যাবার সময় হয়েছে।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ডিগ্রীধারী মানুষের বাস ভারতের কেরালারাজ্যে। তাদের ৮০% মানুষ ডিগ্রী পাস। সেখানকার শিক্ষিত মানুষ মাত্রই সুজন সজ্জ্বন, ভদ্রলোক, মানব দরদী এবং সহজ সরল। আমাদের শিক্ষিত সমাজের এক বিরাট অংশ ব্যাপক দুর্নীতি, অন্যায়, অসত্য ও অসুন্দরে, অভ্যস্ত। আজ দরকার নতুন এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের। আর তাহলো আমরা প্রকৃত জ্ঞানে আলোকিত হয়ে নতুন এক পৃথিবী গড়বো।

সুশিক্ষা বনাম কুশিক্ষাঃ

মানতে হবে জ্ঞানহীন জাতি অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। তারা সভ্যতার সংস্পর্শ পায়না। তারা সভ্যতা ও পৌরনীতিবোধ বিবর্জিত। সেইসব মহৎ গুণাবলী থেকে বঞ্চিত। সব সভ্য সমাজ, দেশ ও জাতি শিক্ষার হার বৃদ্ধির তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বাংলাদেশও সেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই। আমাদের শিক্ষার হার বাড়ছে, মানে আমরা অশিক্ষার হাত থেকে মুক্ত হয়ে সকলে এগুচ্ছি।

কিন্তু শিক্ষিত মানুষ মাত্রই সুশিক্ষিত নয়, সুন্দর মানুষ নয়। শিক্ষার মাঝেও রয়েছে সুশিক্ষা ও কুশিক্ষা। এজন্য আমাদেরকে দোয়া শিখানো হয়েছে- “হে আল্লাহ আমাদের জ্ঞান বাড়িয়ে দিন।” “হে স্রষ্টা আপনি আমাদেরকে কল্যাণময় জ্ঞান (ইলমুন নাফে) দান করুন।” বোঝা গেল অকল্যাণকর, মন্দ জ্ঞান (Bad Knowledge) মানুষকে তিরস্কৃত করে। তাই তা কামনা করতে বলা হয়নি। এ মন্দ জ্ঞানকে Evil Knowledge বা শয়তানী বুদ্ধিও বলা যায়। শয়তান অনেক কিছু জানতো কিন্তু তার সে জ্ঞান কারোই কাজে লাগেনি।

এজন্যই ঐ জ্ঞানে যারা জ্ঞানী ও পন্ডিত তাদেরকে আমরা বলি কুশিক্ষিত, তাদের শিক্ষার নাম কুশিক্ষা, শিক্ষার মাঝে অনেক ক্ষেত্রেই কুশিক্ষার ব্যাপক চর্চা হয়। অঙ্ক করাতে গিয়ে যথা লাভ-লোকসানের অঙ্কের নামে ভেজাল দেয়ার পাঠ দেয়া হয়, যখন অংকের নামে মানবতা বিরোধী, রক্ত চোষা সাইলকের মতো গরীবের গলায় পা দিয়ে সুদের টাকা আদায়ের শিক্ষা দেয়া হয়, যখন গল্প পড়ানোর নামে টোনাটুনির মানুষ ঠকানোর গল্প পড়ানো হয়-তা শিখে বা পড়ে মানুষ কখনোই সুশিক্ষা পেতে পারে না। তাদের মন পরিচ্ছন্ন হতে পারেনা।

আমরা চাই সুশিক্ষা, কুশিক্ষা নয়। প্রাশ্চাত্যের শিক্ষিত সমাজের দিকে তাকাও, একদিকে তারা ঘরে কুকুর পালছে, কুকুরের নামে সম্পত্তি উইল করে দিচ্ছে, অপরদিকে তাদের বৃদ্ধ মা-বাবা Old home (বৃদ্ধাশ্রম) এ ধুকে ধুঁকে মরছে। তাদের পাশেই অসংখ্য বনি আদম না খেয়ে, অবহেলায়, অপচিকিৎসায় জীবন হারাচ্ছে।

ওরা ধর্মকে বিসর্জন দিয়ে মানবতামুক্ত ব্যবস্থাপনায় জীবন যাপন করছে। চারিদিকে যেনো Stainly Hall এর ৫ম R বা Rascality ও বর্বরতার জয় জয়কার।

সাহসের মন্ত্রপাঠ ও তিমির বিনাশীগানঃ

সাহসের মন্ত্র আবার কি?

কে কার মন্ত্রে পীন্ধ নেবে?

সাহসের মন্ত্র কোন অতীন্দ্রিয় বিষয় নয়। মানব সভ্যতায় যুগে যুগে মহাপুরুষেরা এসেছেন সাহসের মন্ত্রে মানুষকে দীক্ষা দিতে। তাঁরা তাদের অপূর্ব সাহসের পরশে মানুষকে দানবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন।

এমন একজন সক্ষম সাহসী শিক্ষাগুরু ছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি জ্ঞানহীন ছিলেন (Illiterate) কিন্তু তিনিই ছিলেন সর্বকালের সেরা জ্ঞানী (Most knowledgeable person)। The Hundred বইয়ের সংকলক মাইকেল হার্ট বহু বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জীবনী গবেষণা করে একশত সেরা মানুষের তালিকা প্রনয়ন করেন। সেখানে সকল বিবেচনায় পৃথিবীর সেরা মানুষ, সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রথমেই স্থান পান মরু দুলাল, আমেনা নন্দন, ইয়াতিম হয়ে জন্ম নেয়া জনমদুঃখী মানুষ হযরত মুহাম্মদ (সঃ)।

আজও পৃথিবীর দিকে দিকে অসংখ্য আলোর দিশারী মানুষের দেখা মিলে। তারা অসহায়ের বন্ধু,বিপন্ন মানুষের সহায়। তারা বুকে বুকে ছড়িয়ে দেন সাহস ও বিজয়ের মন্ত্র। এমনি একজন মানুষ ছিলেন আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মরহুম রাষ্ট্রপতি, মিসাইলম্যান হিসেবেই যিনি সার্বিক পরিচিত, যিনি জন্মগ্রহন করে ছিলেন ভারতের তামিল নাড়ু প্রদেশের এক অজপাড়া গায়ে কৃষক পরিবারে। তিনি নিজেই বলেছেন “স্রষ্টা যেনো আমার মতো এক অতি দরিদ্র ছাত্র আব্দুল কালামের শরীর জুড়ে দিলেন একটি আগুনের ডানা (Wings of fire) তিনি আর কেউ নন এ.পি.জে. আব্দুল কালাম।

এমনি আরেকজন হলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী নেতা- নেলসন ম্যান্ডেলা। দীর্ঘ ২৭বৎসর কারাবাস করেছেন, সংগ্রাম ও লড়াই করেছেন বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে। অবশেষে তাঁর মন্ত্রে জেগে ওঠা সাহসী মানুষেরা সংগ্রামে জয়ী হয়। পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে দেখেছে নতুন দক্ষিণ আফ্রিকা, যারা তিমির বিনাশ করে মানবতার পতাকাকে উর্ধ্বে তুলে ধরেছে।

এইগান গলায় তুলে এই মন্ত্র বুকে নিয়ে আজ সবাইকেই চলতে হবে।

তোমার আলোয় রাঙ্গিয়ে দাও

ঘুমের পাড়া জাগিয়ে দাও

সারা পৃথিবীতে এখন একটা অদ্ভুত প্রবণতা (trend) চলছে। মানুষ যেনো দিনদিন অতিমাত্রায় আত্মত্মকেন্দ্রিক (Self centric) হয়ে পড়ছে। ছুটে যাচ্ছে জাতি, সমাজ, মানবতা ও পারিবারিক বন্ধন। নিউকিয়াস single family-র ধারনার খপ্পরে পড়ে কোথায় যে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষ।

তুমি আজকের শিশু, আজকের কিশোর কিংবা যুবক-আগামীর সকল সম্ভাবনা তোমারই মাঝে। সাহসের মন্ত্র বুকে যৌবনদীপ্ত তোমরাই হবে আগামী দিনের মা বাবা। আজ তোমরা যদিও ছোট, কিন্তু তোমরা যেনো একেকটা আগুনের ফুলকি, আলোর উৎস। তোমরাই সবার জন্য আগুনের পরশমনি।

কেবল নিজে বড় হলেই চলবেনা। আশেপাশে সবাইকে বড় করার মন্ত্র জাগাতে হবে। সেই শুভস্বপ্নোজ্জ্বল সুদিনের প্রত্যাশায় আকাশের দিকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। তোমার আলোয় পৃথিবীটাকে বাড়িয়ে দিও তুমি। তোমার প্রাণ সঞ্চারের ছোঁয়ায় জাগিয়ে দিও সমস্ত ঘুমের পাড়া ও ঘুমন্ত মানুষগুলোকে।